কদিন যাবত খুব ভালো লাগছে এই জন্য, যে ব্যাপারটা নিয়ে যুগ যুগ ধরে চলে আসছিলো লুকোছাপার চেষ্টা, যাকে দেখা হতো এক স্পষ্ট ঘৃনার চোখে, সেটাই এখন চলে এসছে প্রকাশ্যে। সেটা নিয়েই লেখা লেখি করছে নানা বয়েসী মেয়েরা।
এটাই তো হওয়া উচিত, যা একটা নারীর জন্মগত বৈশিষ্ট্য, তা নিয়ে কেন থাকবে এতো ঘৃণা, এতো লজ্জা, এতো হীনমন্যতা?
খুব রক্ষণশীল পরিবারে জন্ম আমার। ধর্মীয় শিক্ষা, নিয়ম কানুন গুলো যেভাবে শেখানো হতো, সেভাবে শেখানো হতো না জীবনের অবশ্যম্ভাবী ব্যাপার গুলো।
আমার মনে পড়ছে প্রথম রজ:স্রাবের সময়ের ভয়াবহ স্মৃতি গুলো। ভেজা ভেজা কেন লাগছে তা চেক করার জন্য ওয়াশ রুমে গিয়ে কী মারাত্মক ভয় পেয়েছিলাম। কাওকে বলতে পারছিলাম না। ভয় পেয়ে বিছানায় কাঁথা মুড়ি দিয়ে কাঁদছিলাম। কোনদিন শুনিনি এরকম কিছু হয় বা হতে পারে। মনে হচ্ছিলো একটু পরেই বোধয় আমি মারা যাবো।
আম্মা কে খুব ভয় পেতাম, তাই তাঁকে বলার তো প্রশ্নই আসে না। ভাগ্য ভালো আমার খালা এসেছিলেন সেদিন। রুমে ঢুকে আমাকে কাঁদতে দেখে কী হয়েছে জিজ্ঞেস করতেই তাঁর কাছে বললাম। খালা তো হেসেই খুন, বললেন, "গাধা মেয়ে, এটা তো সব মেয়েদেরই হয়, আমারো হয়।"
কী অবাক কাণ্ড, তাই না? একটা স্বাভাবিক ব্যাপার আমি জানতে পারিনি আগে। এরপর জানলাম এই সময় কেবল শাক সব্জী খেতে হয়, মাছ মাংস খাওয়া যাবে না। মুরুব্বী দের বিছানায় বসা যাবে না, নামাজের জায়গায় যাওয়া যাবে না। এমনকি আমার দাদীও তাঁর ধারে কাছেই ঘেঁষতে দিতেন না। এসব দেখে শুনে ওই দিন গুলোতে খুব হতাশায় ভুগতাম আমি, নিজেকে অপরাধী মনে হতো। যে দুরন্ত মেয়েটা বিকেল হতে না হতেই বাইরে ছুট দিতো, সে ওই কটা দিন জানলার গ্রিল ধরে বন্ধু দের খেলা দেখতো। ওরা ডাক্লে বলতাম, " আমি অসুস্থ". কী যে অস্বস্তিকর দিন ছিলো তখন ভাবলে এখনও মন খারাপ হয়ে যায়। সেনিটারি ন্যাপকিন নামক যে একটা কিছু আছে, সেটাই তো জানতাম না।
কলেজে উঠে এটার সাথে প্রথম দেখা হয় আমার।
আমরা বান্ধবীরা খুব লজ্জা পেতাম দোকানে গিয়ে প্যাডের কথা বলতে। দিন বদলেছে, এখন আর সেটা নেই, এই তো সেদিন ওষুধের দোকানে দেখলাম গার্মেন্টস থেকে ছুটির পথে আসা মেয়েটি কত স্বাভাবিক ভংঙ্গীতে কিনে নিয়ে গেলো, দোকানদার কেও দেখলাম স্বাভাবিক ভাবেই সেটা ক্রেতার হাতে খবরের কাগজে মুড়ে তুলে দিতে। এমনই হোক, স্বাভাবিক জিনিস্টা ক্রেতা বিক্রেতা স্বাভাবিক ভাবেই দেয়া নেয়া করুক।
এখন আমি একজন মা, আমারও ঘর আলো করে এসেছে একটি কন্যা সন্তান, আমার চতুর্দশী কন্যাটিকে আমি কেবল বুক দিয়েই আগলে রাখছি না, তাকে সব রকম শিক্ষা দিচ্ছি।
একটা মেয়ের কী দরকার, কোন ব্যাপার গুলোতে তার মা এর সাপোর্ট দরকার, তা খুব ভালো ভাবে জেনেছি নিজের জীবন থেকে। তাই ঠিক সেই ব্যাপার গুলোতে আমি আমার মেয়েকে সাপোর্ট দিয়ে যাচ্ছি। আমার মেয়ে খুব স্বাভাবিক থাকে এই দিন গুলোতে, আর ও এও জানে এটা মেয়েদের স্বাভাবিক একটা ব্যাপার। ও জানে এই সময়ে পরিস্কার পরিচ্ছন্ন জীবাণু মুক্ত থাকতে হবে, উইকনেস কাটানোর জন্য ঠিক ঠাক খাওয়া দাওয়া করতে হবে। ওকে জানিয়েছি এটা আছে বলেই আমরা মা হতে পারি, আমাদের গর্ভে বেড়ে উঠে অবাক করা মানব শিশু।
স্রষ্টা কে ধন্যবাদ তিনি নিজেই আমাদের এতো মহীয়ান বৈশিষ্ট্য দিয়ে সৃষ্টি করেছেন বলে, ধন্যবাদ তিনি নিজেই আমাদের শরীরের দূষিত রক্ত গুলো বের হবার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। এই জন্যেই তো মেয়েরা স্নিগ্ধ, সুন্দর ।
So let's say together we are proud for being female and glad to bleed.
সরকারের কাছে আমার চাওয়া একটিই। তা হলো নারী ও কন্যা সন্তানদের স্বাস্থ্যে রক্ষার এবং ভবিষ্যৎ মা কে সুরক্ষিত রাখার জন্য স্যানিটারি ন্যাপকিন গুলোর মূল্য বিবেচনা করা হোক। গ্রামের অনেক মেয়েরা এটা ব্যবহার করতে চায় না কেবল এর দামের জন্যেই, ফলে ওরা নানা রকম মেয়েলী রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। এটা খুব সিরিয়াসলি ভাবা উচিত আমাদের সবারই।
সব নারী ও কন্যা শিশুদের জন্য রইলো আমার ভালোবাসা, শুভ কামনা।
