Wednesday, February 17, 2016

মেয়েরা বাঁচুক মানুষের মর্যাদা নিয়ে


আমাদের দেশের বেশীরভাগ মানুষের মধ্যে একটা ব্যাপার খেয়াল করি আমি, মেয়েদের স্বার্থ নিয়ে কিছু বললেই বলে বসে ' তাসলিমা নাসরিন' হইসেন নাকি?
আমি স্পষ্ট করেই বলতে চাই "নারীবাদ মানে তসলিমা নাসরিন না"।
নারীবাদ মানে সুস্থ ভাবে, সম্মান নিয়ে বেঁচে থাকার অধিকার নিয়ে কথা বলা, চিন্তা করা, সমাজে সচেতনতার সৃষ্টি করা। ছেলেরা প্যান্ট শার্ট পরে, মেয়েরা কেন পারবে না, ওরাও পরবে- এটা নারীবাদ না। 

ছেলেরা রাস্তা ঘাটে যা করে, মেয়েরাও তা-ই করবে- এটা নারীবাদ না।
এগুলো উগ্রতা, আর উগ্রতা কখনও ভালো ফল বয়ে আনে না। শার্ট,প্যান্ট পরলেই কেউ স্মার্ট হয়ে যাবে না, যদি না তার ভেতরে কোন জ্ঞান না থাকে, যদি না তার ভেতরে প্রজ্ঞার অভাব থাকে, যদি না তার মধ্যে শালিনতা না থাকে।
তবে এটাও মাথায় রাখতে হবে হিজাব পরলেই কেউ শালিন হয়ে যায় না, বা হিজাব না পরলেও কেউ অশালিন হয়ে যায় না। অনেক হিজাবী কে দেখেছি চরম অশালীন,উগ্র তার সাজ পোশাকে। আবার অনেক হিজাব বিহীন নারী কে দেখেছি স্নিগ্ধ, সুন্দর, অমায়িক, দেখলেই শ্রদ্ধা জাগে মন থেকে।
যা কিছু সুস্থ, স্বাভাবিক, সুন্দর- তাতে নারী,পুরুষ উভয়ের অংশগ্রহনের অধিকার নিশ্চিত করার কথা বলাই হচ্ছে নারীবাদ।
শিক্ষা একটা মৌলিক অধিকার। 
কিন্তু এখনও অনেকেই বলেন মেয়েরা বেশী লেখা পড়া করলে ভালো বিয়ে হয় না......উচ্চমাধ্যমিকের পর পর বিয়ে না দিলে মেয়েদের চেহারা নষ্ট হয়ে যায়, পাত্র পক্ষ কম বয়েসী মেয়ে চায়। এগুলো কিন্তু গ্রামের কোন মহিলার কথা না, এই শহরের মানুষদেরই মুখের কথা। এগুলোর আড়ালে কি এটাই বোঝায় না যে মেয়েরা কেবল রান্না ঘর, বাচ্চা উতপাদন আর স্বামীর মনোরঞ্জনের জন্যেই জন্মেছে?
এই যদি হয় আমাদের চিন্তা ভাবনা, তাহলে কী করে আমরা এগিয়ে নিয়ে যাবো আমাদের মেয়েদের? বাচ্চা বয়েসী মেয়ে কেন বিয়ের বাজারে উপযুক্ত? কচি বলে? এই শতাব্দীতে এসেও যদি আমরা এতো নিচু মানের চিন্তা ভাবনা করি, তাহলে মধ্য যুগের বা সেই আদ্যি কালের জংলী মানুষ গুলোর থেকে কীভাবে আলাদা হলাম আমরা?
প্রতিটা মেয়েকে লেখা পড়া শিখতে হবে, সে গ্রামের হোক কিংবা শহরের, সুন্দর হোক, কিংবা কালো।
প্রতিটা মেয়েকে স্বাবলম্বী হবার মতো দক্ষতা অর্জন করতে হবে, যেন স্বামী মারা গেলে তাঁকে অন্যের দয়ায় বেঁচে থাকতে না হয়। 

প্রতিটা মেয়েকে এমনভাবে নিজেদের গড়ে তুলতে হবে যাতে শুধু মাত্র আর্থিক অসহায়ত্বের জন্য মুখ বুজে স্বামীর অকথ্য অত্যাচার সহ্য করতে না হয়।
মেয়েরা বাঁচুক মানুষের মর্যাদা নিয়ে, সম্মান নিয়ে। নারী পুরুষ উভয় উভয়ের প্রতি সম্মান আর ভালোবাসায় গড়ে তুলুক এক সুন্দর পৃথিবী। 

কারো নীরব অশ্রু যেন আমাদের জীবনকে অভিশপ্ত না করে - এটাই হলো নারীবাদের মূল কথা।

Monday, December 7, 2015

'হ্যাপি ব্লিডিং' এবং আমার কথা

Happy Bleeding


কদিন যাবত খুব ভালো লাগছে এই জন্য,  যে ব্যাপারটা নিয়ে যুগ যুগ ধরে চলে আসছিলো লুকোছাপার চেষ্টা, যাকে দেখা হতো এক স্পষ্ট ঘৃনার চোখে, সেটাই এখন চলে এসছে প্রকাশ্যে। সেটা নিয়েই লেখা লেখি করছে নানা বয়েসী মেয়েরা

এটাই তো হওয়া উচিত, যা একটা নারীর জন্মগত বৈশিষ্ট্য,  তা নিয়ে কেন থাকবে এতো ঘৃণা, এতো লজ্জা, এতো হীনমন্যতা?

খুব রক্ষণশীল পরিবারে জন্ম আমার। ধর্মীয় শিক্ষা, নিয়ম কানুন গুলো যেভাবে শেখানো হতো, সেভাবে শেখানো হতো না জীবনের অবশ্যম্ভাবী ব্যাপার  গুলো।

আমার মনে পড়ছে প্রথম রজ:স্রাবের সময়ের ভয়াবহ স্মৃতি গুলো।  ভেজা ভেজা কেন লাগছে তা চেক করার জন্য ওয়াশ রুমে গিয়ে কী মারাত্মক ভয় পেয়েছিলাম। কাওকে বলতে পারছিলাম না। ভয় পেয়ে বিছানায় কাঁথা মুড়ি দিয়ে কাঁদছিলাম। কোনদিন শুনিনি এরকম কিছু হয় বা হতে পারে। মনে হচ্ছিলো একটু পরেই বোধয় আমি মারা যাবো।

আম্মা কে খুব ভয় পেতাম, তাই তাঁকে বলার তো প্রশ্নই আসে না। ভাগ্য ভালো আমার খালা এসেছিলেন সেদিন। রুমে ঢুকে আমাকে কাঁদতে দেখে  কী হয়েছে জিজ্ঞেস করতেই তাঁর কাছে বললাম। খালা তো হেসেই খুন, বললেন, "গাধা মেয়ে, এটা তো সব মেয়েদেরই হয়, আমারো হয়।"

কী অবাক কাণ্ড, তাই না? একটা স্বাভাবিক ব্যাপার আমি জানতে পারিনি আগে। এরপর জানলাম এই সময় কেবল শাক সব্জী খেতে হয়, মাছ মাংস খাওয়া যাবে না। মুরুব্বী দের বিছানায় বসা যাবে না, নামাজের জায়গায় যাওয়া যাবে না। এমনকি আমার দাদীও তাঁর ধারে কাছেই ঘেঁষতে দিতেন না। এসব দেখে শুনে ওই দিন গুলোতে খুব হতাশায় ভুগতাম আমি, নিজেকে অপরাধী মনে হতো। যে দুরন্ত মেয়েটা বিকেল হতে না হতেই বাইরে ছুট দিতো, সে ওই কটা দিন জানলার গ্রিল ধরে বন্ধু দের খেলা দেখতো। ওরা ডাক্লে বলতাম, " আমি অসুস্থ". কী যে অস্বস্তিকর দিন ছিলো তখন ভাবলে এখনও মন খারাপ হয়ে যায়। সেনিটারি ন্যাপকিন নামক  যে একটা কিছু আছে, সেটাই তো জানতাম না।
 কলেজে উঠে এটার  সাথে প্রথম দেখা হয় আমার।

আমরা বান্ধবীরা  খুব লজ্জা পেতাম দোকানে গিয়ে প্যাডের কথা বলতে। দিন বদলেছে, এখন  আর সেটা নেই, এই তো সেদিন ওষুধের দোকানে দেখলাম গার্মেন্টস থেকে ছুটির পথে আসা মেয়েটি কত স্বাভাবিক ভংঙ্গীতে কিনে নিয়ে গেলো, দোকানদার কেও দেখলাম স্বাভাবিক ভাবেই সেটা ক্রেতার হাতে খবরের কাগজে মুড়ে তুলে দিতে। এমনই হোক, স্বাভাবিক জিনিস্টা ক্রেতা বিক্রেতা স্বাভাবিক ভাবেই দেয়া নেয়া করুক। 

এখন আমি একজন  মা, আমারও ঘর আলো করে এসেছে একটি কন্যা সন্তান, আমার  চতুর্দশী কন্যাটিকে আমি কেবল বুক দিয়েই আগলে রাখছি না, তাকে সব রকম শিক্ষা দিচ্ছি।

একটা মেয়ের কী দরকার, কোন ব্যাপার গুলোতে তার মা এর সাপোর্ট দরকার, তা খুব ভালো ভাবে জেনেছি নিজের জীবন থেকে। তাই ঠিক সেই  ব্যাপার গুলোতে  আমি আমার মেয়েকে সাপোর্ট  দিয়ে যাচ্ছি। আমার মেয়ে খুব স্বাভাবিক থাকে এই দিন গুলোতে, আর ও এও জানে এটা মেয়েদের স্বাভাবিক একটা ব্যাপার। ও জানে  এই সময়ে পরিস্কার পরিচ্ছন্ন জীবাণু মুক্ত থাকতে হবে,  উইকনেস কাটানোর জন্য ঠিক ঠাক খাওয়া দাওয়া করতে হবে। ওকে জানিয়েছি  এটা আছে বলেই  আমরা মা হতে পারি, আমাদের গর্ভে বেড়ে উঠে অবাক করা মানব শিশু।

স্রষ্টা কে ধন্যবাদ তিনি নিজেই আমাদের এতো মহীয়ান বৈশিষ্ট্য দিয়ে সৃষ্টি করেছেন বলে, ধন্যবাদ তিনি নিজেই আমাদের  শরীরের দূষিত রক্ত গুলো বের হবার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। এই জন্যেই তো মেয়েরা স্নিগ্ধ, সুন্দর ।

So let's say together we are proud for being   female and glad to bleed.


সরকারের কাছে আমার চাওয়া একটিই। তা হলো   নারী ও কন্যা সন্তানদের স্বাস্থ্যে রক্ষার এবং ভবিষ্যৎ মা কে সুরক্ষিত রাখার জন্য স্যানিটারি ন্যাপকিন গুলোর মূল্য বিবেচনা করা হোক। গ্রামের অনেক মেয়েরা এটা ব্যবহার করতে চায় না কেবল এর দামের জন্যেই, ফলে ওরা নানা রকম মেয়েলী রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। এটা খুব সিরিয়াসলি ভাবা উচিত আমাদের সবারই।

সব নারী ও কন্যা শিশুদের জন্য রইলো আমার ভালোবাসা, শুভ কামনা।

#happy_bleeding